ফুলজোড় ও করতোয়া নদী রক্ষায় ঢাকায় তরুণদের প্রতিবাদ 

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ মার্চ, ২০২৬, ০৬:১৭ বিকাল

উত্তরবঙ্গের ফুলজোড় ও করতোয়া নদীর দূষণের প্রতিবাদে রাজধানীতে শিল্পবর্জ্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে সামিল হলেন তরুণ জলবায়ু ও পরিবেশকর্মীরা। বৃহস্পতিবার ঢাকায় আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে শতাধিক তরুণ অংশ নেন। কর্মসূচির আয়োজন করে পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবাল।

 আন্দোলনকারীরা শিল্পবর্জ্যের বিষয়ে জরুরি তদন্ত, পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, দূষণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নদী রক্ষায় কাজ করা পরিবেশকর্মীদের হয়রানি বন্ধের দাবি জানান।

প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ফুলজোড় নদীর দুই তীরে সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলার কয়েক লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য নদীটির ওপর নির্ভরশীল। শিল্পবর্জ্যের কারণে নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের পরিবারের মালিকানাধীন এসআর কেমিক্যালস ও মজুমদার প্রোডাক্টসসহ কয়েকটি শিল্প কারখানার রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে ফুলজোর, করতোয়া ও বাঙালি নদী মারাত্মক দূষণের শিকার।

সিরাজগঞ্জের তরুণ পরিবেশকর্মী ফয়সাল বিশ্বাস বলেন, “নদী আমাদের জীবনপ্রবাহ। নদী দূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আমরা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, আমাদের জীবিকাও হারাব। নদী নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।”

ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, “নদী জীবন্ত সত্তা। কিন্তু শিল্পবর্জ্যের দূষণ আমাদের নদীকে বিধ্বস্ত করছে এবং বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশের নদীগুলো আমাদের জীবিকা ও পরিবেশের মূল ভিত্তি। একটি নদী দূষিত হলে তার প্রভাব শুধু স্থানীয় এলাকায় নয়, গোটা বাস্তুতন্ত্রে পড়ে। তরুণ ও স্থানীয় জনগণ একত্র হয়ে নদী রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করছে।”

২০১৯ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্ট ঐতিহাসিক রায়ে দেশের সব নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ বা আইনি ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে। মানুষ বা প্রাণীর মতো নদীরও বেঁচে থাকার ও আইনি অধিকার রয়েছে। এই রায়ের ফলে নদী দূষণ বা দখলের বিরুদ্ধে নদী নিজের নামে মামলা করতে পারবে এবং নদী রক্ষা কমিশন এর অভিভাবক হিসেবে কাজ করবে।

প্রতিবাদ আয়োজক অঙ্কিতা সাহা বলেন, “যদি নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে তাকে ক্ষতি করা মানে একটি আইনি সত্তাকে ক্ষতি করা। নদীর অভিভাবক জাতীয় নদী কমিশন ঘুমাচ্ছে, কিন্তু উল্টো নদী রক্ষায় যারা প্রতিবাদ করছেন তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। নদী রক্ষা আন্দোলনে তরুণদের সংহতি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ বার্তা দিয়েছে যে তারা নদী, পরিবেশ এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে।”

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে ফুলজোড় নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে মাছ, সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া ও শামুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। প্রতিবাদ ও স্থায়ী সমাধানের দাবিতে ২৪ ফেব্রুয়ারি ধানগড়ায় মানববন্ধন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি চান্দাইকোনা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একই দাবিতে আরেকটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সচেতন নাগরিক সমাজ, ফুলজোড় নদী রক্ষা আন্দোলন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নিজেরা করি’ এবং ভূমিহীন সংগঠন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এই কর্মসূচির উদ্যোগ নেয়।

পরবর্তীতে আন্দোলনকারীরা বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় এসআর কেমিক্যাল ও মজুমদার কোম্পানির সামনে গিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করে। এসব কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নামে শেরপুর থানায় চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। থানা–পুলিশ সঠিক তদন্ত না করেই মামলা রেকর্ড করেছে এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত রবিবার রাত সাড়ে ১০টায় শেরপুর উপজেলার সীমাবাড়ি ইউনিয়নের বাজার এলাকা থেকে পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন সীমাবাড়ি ইউনিয়নের বেটখৈর গ্রামের তৌহিদুর রহমান ওরফে বাবু (৪৫) এবং সীমাবাড়ি বাজার এলাকার আলী রেজা বিশ্বাস (৫০)। সোমবার দুপুরে তাদের বগুড়ার আদালতে পাঠানো হয় এবং বিকেলে জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে। তবে বাকি পরিবেশ কর্মীরা হয়রানির মুখে রয়েছেন এবং পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

পরিবেশকর্মীরা দাবি করছেন, নদী রক্ষা আন্দোলন অব্যাহত থাকবে এবং তারা নদী, পরিবেশ ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সবসময় সচেতন ও সক্রিয়ভাবে লড়াই চালিয়ে যাবে।

Link copied!