কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচনে লড়ছেন তিন পাহাড়ি কন্যা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট, ২০২৫, ১০:৪০ রাত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচন নিয়ে সরগরম দেশের তরুণ-তরুণীরা। জমজমাট আলোচনা ফেসবুকজুড়ে। এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও উপজাতি শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রাধান্য থাকলেও এবারের নির্বাচনে তাদের পাশাপাশি পাহাড়ি ছাত্রদের ভোটে অংশগ্রহণ বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোট ১০টি প্যানেল ও কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে অন্তত চারটি প্যানেলে দেখা গেছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও উপজাতি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই অংশগ্রহণ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও বৈচিত্র্যময় ও অংশগ্রহণমূলক করেছে। ভোটারদের অনেকেই মনে করছেন, ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক মত নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণই ডাকসুকে আরও গণতান্ত্রিক করে তুলছে। নির্বাচনে বাঙালিদের পাশাপাশি ৩ পাহাড়ি কন্যাও ডাকসু নির্বাচনে নিজেদের লড়ে যাওয়ার আভাস দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। 

তাঁরা হলেন: ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ (উমামা ফাতেমা প্যানেল) থেকে পাঠকক্ষ ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে সুর্মী চাকমা, ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক পদে রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা, এবং বাম সংগঠনগুলোর ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ থেকে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে হেমা চাকমা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করছে-ডাকসু এখন ক্রমেই দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য সমতার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে। পাহাড়ি এবং বাঙালি সব শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এখান থেকে দেশের জন্য সমানভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন।

যেসব বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছেন পাহাড়িরা

নির্বাচনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও উপজাতি প্রার্থীদের জয়লাভের সম্ভাবনা কতটুকু তা নিয়ে এখনি কিছু বলছেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা জানিয়েছেন, যেসব বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে এবারের ভোটে তা নিয়ে সবার ভেতরই চলছে আলোচনা। ইতোমধ্যে এসব পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের ইশতেহারে ক্যারিয়ার উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি, এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ তৈরির মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে, যা সরাসরি শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যার একটি বড় অংশের সমাধান দেয়। 

এই বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতিগুলো ভোটারদের কাছে টানছে বলে অনেকে মনে করছেন। এছাড়া, তারা ব্যক্তিগত সংযোগ ও ক্ষুদ্র পরিসরে প্রচারণায় জোর দিচ্ছেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ব্যক্তিগত আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করছেন। যা তাদের পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলছে। 

সচেতন ভোটাররা মনে করছেন, বড় প্যানেলগুলোর মধ্যে ভোট বিভাজন হলে এই প্রার্থীরা অল্প সংখ্যক কিন্তু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সমর্থন নিয়েই জয়লাভের সুযোগ পেতে পারেন। তাদের বিজয় কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং ছাত্র রাজনীতিতে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। আর সেদিকেই কৌশলী হচ্ছে পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা। 

আলোচনায় ৩ পাহাড়ি কন্যা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা। তিনি রাঙ্গামাটির রাজস্থলী উপজেলার বাসিন্দা। 

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী ও শামসুন নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী হেমা চাকমা। তিনি খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার সন্তান। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী সুর্মী চাকমা। তিনি খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি উপজেলার সন্তান। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুলাই-গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থেকে সাহসী ও যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিল এই পাহাড়ি কন্যারা। আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে তাদের নানা ধরনের হেনস্তা, হামলা ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। 

জানতে চাইলে রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, আমি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ছিলাম। আমি বিজয়ী হলে শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা করতে চাই। ক্যারিয়ার ফেস্ট, অ্যাকাডেমিক ইন্টার্নশিপ, মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম, ডিজিটাল রিসোর্স হাব, কারিগরি বা ব্যবহারিক দক্ষতামূলক বিভিন্ন কোর্স, স্কলারশিপ, ভাষা শিক্ষা কোর্স, দেশীয় চাকরির জন্য পরামর্শমূলক সেমিনার, উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সিং এর জন্য উদ্যেক্তা মেলা ও প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পার্ট টাইম (খণ্ডকালীন) চাকুরির ব্যবস্থা করবো।

অন্যদিকে সুর্মী চাকমা কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে লড়ছেন। তিনি জানান, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতিতে অ্যাকাডেমিক ও সহায়ক বইগুলো সহজলভ্য, চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে স্টেশনারী স্থাপন ও খণ্ডকালীন চাকুরির ব্যবস্থা ও ঢাবি গ্রন্থাগার ডিজিটালাইজড করতে চাই। 

তিনি আরও বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে প্রতিবন্ধীদের জন্য অ্যাক্সেসিবল (সুগম) ক্যাম্পাস, ক্লাসরুম, ওয়াশরুম, নারী শিক্ষার্থীদের কমনরুমের পরিবেশ, খাবার ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় কাজ করেছি। তবে ডাকসুতে জয়ী হই বা না হই, আমার সহযোগিতা সবসময় অব্যাহত থাকবে। 

হেমা চাকমা বাম সংগঠনগুলোর 'প্রতিরোধ পর্ষদ' প্যানেল থেকে সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তার ভাবনাটা শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কমানো নিয়ে। তিনি জানান, রেজিস্ট্রার বিল্ডিং এর 'লাঞ্চের পরে আসেন' কথাটিকে জাদুঘরে রেখে 'প্লীজ প্লীজ, এখনি আসেন' কথা বাস্তবায়ন, সর্ব রোগের ঔষধ নাপা'র বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত, মেডিক্যাল সেন্টার আধুনিকায়ন ও স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা সহজতর করতে কাজ করতে চাই।

Link copied!